Archive

Category Archives for "Bangla Kobita"

তেজ – দেবব্রত সিংহ

আমি জামবনির কুঁইরি পাড়ার
শিবু কুঁইরির বিটি সাঁঝলি
কাগজ আওলারা বললেক,
উঁহু অতটুকন বললে হবেক কেনে
তুমি ইবারকার মাধ্যমিকে পথম
তুমাকে বলতে হবেক আর অ কিছু।
টিভি আওলারা বললেক,
তুমি ক্ষেতমজুরের মেইয়া
তুমি কী করে কামিন খাটে মাধ্যমিকে পথম হলে
সেটা তুমাকে বলতে হবেক খুলে
পঞ্চায়েতের অনি বৌদি, পধান,উপপধান,এম.এল.এ.এম.পি.
সবাই একবারি হামলে পড়ল আমাদে মাটির কুঁড়াঘরে ।
জামবনি ইস্কুলের হেডমাস্টার কন বিহানবেলায়
টিনের আগুড় খুলে
হাঁকে ডাকে ঘুম ভাঙ্গাই
খবরটা যখেন পথম শুনালেক
তখেন মা কে জড়াই শুয়েছিলম আমি,
কুঁড়াঘরের ঘুটঘুটা অন্ধকারে
হেডমাস্টার কে দেখে
মায়ের পারা আমিও চোখ কচালে হাঁ হয়ে ভালেছিলম
ইকি স্বপুন দেখছি নকি,
সার বললেক ,ইটা স্বপুন লয় সত্যি বঠে।
কথাটা শুনে কাঁদে ভাসাইছিলম আমরা দু মা বিটি
আজ বাপ বাঁচে থাকলে
মানুষটাকে দেখাতে পারথম
আমি দেখাতে পারথম বহুত কিছু
আমার বুকের ভিতরে যে তেজাল সনঝাবাতিটা
জ্বালে দিয়েছিল মানুষটা
সেই বাতিটা আজকে কেমন আমাদে কুঁড়াঘরটাকে
আলো করেছে সেটা দেখাতে পারথম ।
আপনারা বলছেন বঠে
কথাটা শুনতে কিন্তুক খুব ভাল অ,
“তুমাদে মতন মেইয়ারা যদি উঠে আসে
তাহালে আমাদে গোটা দেশটাই উঠে আসে”,
কিন্তক উঠে আসার রাস্তাটা যে আখনও তয়ার হয় নাই
খাড়া পাহাড়ে উঠা যে কী জিনিস
বহুত দম লাগে
বহুত তেজ লাগে।

আমি জামবনির শিবু কুঁইরির বিটি সাঁঝলি
যখন থাকে হুঁস হ ইছে তখন থাকে শুনে আসছি
” বিটি না মাটি”,
ঠাকুমা বলথক,
পরের ঘরে হিঁসাল ঠেলবেক তার আবার লেখাপড়া
গাঁয়ের বাবুরা বলথক,
তুই কুঁইরিপাড়ার বিটিছেলা
তোর কামীনখাটা ছাড়া গতি কি ।
বাপ বলথক, দেখ সাঁঝলি
মন খারাপ করলি ত হারে গেলি
শুন যে যা বলছে বলুক
ইসব কথা এক কানে সিমালে
আরেক কানে বার করে দিবি ।

তখেন বাবু পাড়ার কুচিল দেঘরার ঘরে
কামীন খাটতক মা
ক্ষয় রোগের তাড়সে মায়ের গতরটা ভাঙ্গে নাই আতটা
মাঝেমধ্যে জ্বর টর আসত,
জ্বর আল্যে মা চুপচাপ এগনাতে তালাই পাতে
শুয়ে থাকত,
মনে আছে সে ছিল এক জাড়কালের সকাল
রোদ উঠেছিল ঝলমলানি
ঝিঙাফুলা রোদ,
আমি সে রোদে পিঠ দিয়ে গা দুলাই পড়ছিলম
ইতিহাস
ক্লাস সেভেনের সামন্ত রাজাদের ইতিহাস।
দেঘরা গিন্নি লোক পাঠাইছিল বারকতক
মায়ের জ্বর
সে তারা শুনতে নাই চায়
আমাদে দিদিবুড়ি তখন বাঁচে
কুলতলায় বসে ছেঁড়া কম্বল মুড়ি দিয়ে
বিড়ি ফুঁকছিল বুড়ি
শেষতক বুড়ি সেদিন পড়া থাকে উঠাই
মায়ের কাজটুকুন করতে পাঠাইছিল বাবু ঘরে ।
পুরন অ ফটক ঘেরা উঠান
অতবড় দরদালান
অত বড় বারান্দা
সব ঝাঁটপাট দিয়ে সাফসুতরা করে
আসছিলম চল্যে ,
দেঘরা গিন্নি নাই ছাড়লেক
একগাদা এঁটাকাটা জুঠা বাসন
আমার সামনে আনে ধরে দিলেক।
বললম,তুমাদে জুঠা বাসন আমি ধুতে নাই পারব।
বাবু গিন্নির সে কী রাগ ,
কী বললি
আরেকবার বল দেখনি
যতটুকুন মু লয় ততবড় কথা
জানিস তোর মা, তোর মায়ের মা, তার মায়ের মা
সবাই আমাদে জুঠা বাসন ধুইয়ে
আতককাল গুজারে গেল
আর তুই বললি জুঠা বাসন ধুতে লারবি ?
বললম, হ,তুমাদে জুঠা বাসন আমি ধুতে লারব
তুমরা লোক দেখে লাও গা
আমি চললম।
কথাটা বলে গটগট করে
বাবু গিন্নির মুখের সামনে
আমি বেরাই চল্যে আইছিলম।

তাবাদে সে লিয়ে কী কান্ড কী ঝামালা
বেলা ডুবলে মাহাতোদে ধান কাটে
বাপ ঘরকে আলে
দু পাতা লেখাপড়া করা লাতনীর
ছোট মুখে বড় থুতির কথা
সাতকাহন করে বলেছিল দিদিবুড়ি,
মা কোনো রা কাড়ে নাই
আঘনমাসের সনঝাবেলায় এগনাতে আগুন জ্বালে
গা হাত পা সেঁকছিল মা,
এক মাথা ঝাঁকড়া কালো চুল ঝাঁকানো বাপের
পেটানো পাথরের মুখটা
ঝলকে উঠেছিল আগুনের আঁচে ।
বাপের অমন চেহারা
আমি কোনোদিন দেখি নাই
বাপ সেদিন মা আর দিদিবুড়ির সমুখে
আমাকে কাছকে ডাকে
মাথায় হাত বুলাই গমগমা গলায় বলেছিল,
যা করেছিস বেশ করেছিস,
শুন , তোর মা, তোর মায়ের মা, তার মায়ের মা
সবাই করেছে কামীন গিরি
বাবু ঘরে গতর খাটাই খাইছে
তাতে হ ইছে টা কী,
ই কথাটা মনে রাখবি
তুই কিন্তুক কামীন হওয়ার লাগে জন্মাস নাই
যত বড় লাট সাহেব ই হোক কেননে
কারু কাছে মাথা নুয়াই লিজের তেজ বিকাবি নাই
এই তেজ টুকুনের লাগে লেখাপড়া শিখাচ্ছি তোকে
নাহালে আমাদে পারা হাভাতা মানুষের ঘরে
আর আছেটা কি।

আমি জামবনির কুঁইরি পাড়ার
শিবু কুঁইরির বিটি সাঁঝলি
কবেকার সেই ক্লাস সেভেনের কথা ভাবতে যাইয়ে
কাগজ আওলা টিভি আওলাদের সামনে আখন
কী যে বলি
তালপাতার রঁদ দিয়ে ঘেরা গোবুরলাতার এগনা তে লোকে আখন লোকাকার।
তার মাঝে বাঁশি বাজাই জীবগাড়িতে চাপে
আগু পেছু পুলিশ লিয়ে মন্ত্রী আলেক ছুটে,
কোথায় সাঁঝলি কুঁইরি কোথায়
বলতে বলতে বন্দুকধারী পুলিশ লিয়ে
সোজা আমাদে মাটির কুঁড়াঘরে।
হেড সার বললেক, প্রনাম কর সাঁঝলি প্রণাম কর,
মন্ত্রী তখন পিঠ চাপড়ালেক
পিঠ চাপড়াই বললেক,
তুমি কামীন খাটে মাধ্যমিকে প্রথম
তাই তুমাকে দেখতে আলম
সত্যি বড় গরিব অবস্থা
তুমাদে মতন গরিব ঘরের মেয়েরা যাতে উঠে আসে
তার লাগে আমাদের পার্টি
তার লাগে আমাদের সরকার
নাও দশ হাজার টাকার চেক টা আখন নাও
শোনো আমরা তোমাকে আরো টাকা তুলে দেব
ফুল দেব
সম্বর্ধনা দেব
এই টিভির লোক কাগজের লোক কারা আছেন
এদিকে আসুন।

তক্ষুনি ছোট বড় কত রকমের সব
ঝলকে উঠল ক্যামেরা
ঝলকে উঠল মন্ত্রীর মুখ
না না মন্ত্রী লয়
ঝলকে উঠল আমার বাপের মুখ
গনগনা আগুনের পারা আগুন মানুষের মুখ
আমি তখুনি বলে উঠলম,
না না ই টাকা আমার নাই লাগবেক
আর আমাকে যে ফুল দিবেন সম্বর্ধনা দিবেন
আর অ দেদার টাকা তুলে দিবেন
তাও আমার নাই লাগবেক।
মন্ত্রী তখন ঢোক গিললেক
গাঁয়ের সেই দেঘরা গিন্নির বড় বেটা
সে আখন পার্টির বড় লেতা
ভিড় ঠেলে সে আসে বললেক,
কেনে কী হ ইছে রে সাঁঝলি
তুই ত আমাদে ঘরে কামীন ছিলি
বল তোর লাগে আমরা কি করতে পারি বল
তোর কি লাগবেক সেটা খুলে বল।

বললম, আমার পারা শয়ে শয়ে আরো অনেক
সাঁঝলি আছে
আরো শিবু কুঁইরির বিটি আছে গাঁ গেরামে
তারা যদ্দিন অন্ধকারে পড়ে থাকবেক
তারা যদ্দিন লেখাপড়ার লাগে কাঁদে বুলবেক
তদ্দিন কোনো বাবুর দয়া নাই লাগবেক
তদ্দিন কোনো বাবুর দয়া আমার নাই লাগবেক।

 

সায়াহ্নে – কায়কোবাদ

হে পান্থ, কোথায় যাও কোন্ দূরদেশে
কার আশে? সে কি তোমা করিছে আহ্বান?
সম্মুখে তামসী নিশা রাক্ষসীর বেশে
শোন না কি চারিদিকে মরণের তান!
সে তোমারে ওহে পান্থ, হাসিমুখে এসে,
সে তোমারে ছলে বলে গ্রাসিবে এখনি |
যেয়োনা একাকী পান্থ, সে দূর বিদেশে,
ফিরে এসো, ওহে পান্থ, ফিরে এসো তুমি |
এ ক্ষুদ্র জীবন লয়ে কেন এত আশা?
জান না কি এ জগত্ নিশার স্বপন?
মায়া মরীচিকী প্রায় স্নেহ ভালবাসা—
জীবনের পাছে ওই রয়েছে মরণ
হে পান্থ হেথায় শুরু আঁধারের স্তর ;
মৃত্যুর উপর মৃত্যু, মৃত্যু তার পর!

কে তুমি – কায়কোবাদ

( ১ )
কে তুমি? — কে তুমি?
ওগো প্রাণময়ী,
কে তুমি রমণী-মণি!
তুমি কি আমার, হৃদি-পুষ্প-হার
প্রেমের অমিয় খনি!
কে তুমি রমণী-মণি?

( ২ )
কে তুমি?—
তুমি কি চম্পক-কলি?
গোলাপ মতি
তুমি কি মল্লিকা যুথী ফুল্ল কুমুদিনী?
সৌন্দর্যের সুধাসিন্ধু,
শরতের পূর্ণ ইন্দু
আঁধার জীবন মাঝে পূর্ণিমা রজনী!
কে তুমি রমণী-মণি?

( ৩ )
কে তুমি? —
তুমি কি সন্ধ্যার তারা, সুধাংশু সুধা-ধারা
পারিজাত পুষ্পকলি
বিশ্ব বিমোহিনী
অথবা শিশির স্নাতা, অর্ধস্ফুট, অনাঘ্রাতা
প্রণয়-পীযূষ ভরা,সোনার নলিনী!
কে তুমি রমণী-মণি?

( ৪ )
কে তুমি?—
তুমি কি বসন্ত-বালা, অথবা প্রেমের ডালা,
প্রাণের নিভৃত কুঞ্জে
সুধা-নির্ঝরিনী!
অথবা প্রেমাশ্রু-ধারা, শোকে দুঃখে আত্মহারা
প্রেমের অতীত স্মৃতি,
বিধবা রমণী!
কে তুমি রমণী-মণি?

( ৫ )
কে তুমি?—
তুমি কি আমার সেই
হৃদয়-মোহিনী?
সেই যদি,—কেন দূরে? এস, এই হৃদি-পুরে
এস’ প্রিয়ে প্রাণময়ী,
এস’ সুহাসিনী!
এস’ যাই সেই দেশে,—ফুল ফুটে চাঁদ হাসে
দয়েলা কোয়েলা গায়
প্রাণের রাগিণী!
জরা নাই—মৃত্যু নাই, প্রণয়ে কলঙ্ক নাই
চল যাই সেই দেশে
এস’ সোহাগিনী!
কে তুমি রমণী-মণি?

দেশের বাণী – কায়কোবাদ

কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী?
এ দেশের লোক যারা,
সকলইতো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি!
সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়ে উঠে – চোখ ভরা পানি।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!
এ দেশের লোক যত
বিলাস ব্যসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা।
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!
প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভূমি-পারা!

আযান – কায়কোবাদ

কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি।
মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।
কি মধুর আযানের ধ্বনি!
আমি তো পাগল হয়ে সে মধুর তানে,
কি যে এক আকর্ষণে, ছুটে যাই মুগ্ধমনে
কি নিশীথে, কি দিবসে মসজিদের পানে।
হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত-ধারে,
কি যে এক ঢেউ উঠে ভক্তির তুফানে-
কত সুধা আছে সেই মধুর আযানে।
নদী ও পাখির গানে তারই প্রতিধ্বনি।
ভ্রমরের গুণ-গানে সেই সুর আসে কানে
কি এক আবেশে মুগ্ধ নিখিল ধরণী।
ভূধরে, সাগরে জলে নির্ঝরণী কলকলে,
আমি যেন শুনি সেই আযানের ধ্বনি।
আহা যবে সেই সুর সুমধুর স্বরে,
ভাসে দূরে সায়াহ্নের নিথর অম্বরে,
প্রাণ করে আনচান, কি মধুর সে আযান,
তারি প্রতিধ্বনি শুনি আত্মার ভিতরে।
নীরব নিঝুম ধরা, বিশ্বে যেন সবই মরা,
এতটুকু শব্দ যবে নাহি কোন স্থানে,
মুয়াযযিন উচ্চৈঃস্বরে দাঁড়ায়ে মিনার ‘পরে
কি সুধা ছড়িয়ে দেয় উষার আযানে!
জাগাইতে মোহমুদ্ধ মানব সন্তানে।
আহা কি মধুর ওই আযানের ধ্বনি।
মর্মে মর্মে সেই সুর বাজিল কি সমধুর
আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।

প্রণয় – পাবলো নেরুদা

অনুবাদ: রহমান হেনরী

তোমার প্রসঙ্গ উঠে আসে, পুষ্প-ফোটা উদ্যানে উদ্যানে
আমি তো আহত হই, বসন্তের সুমিষ্ট সুবাসে।
আমি তো গিয়েছি ভুলে ওই মুখ, আজ আর স্মরণে আসে না
সেই হাত দুটি; কীভাবে ও দুটি ঠোঁট
আমাকে গিলেছে, নেই মনে।
মন গেছে তোমারই তো দিকে, ভালোবাসি শাদা শাদা পাষাণ মূর্তিকে
উদ্যানে মলিন হয়ে আছে যারা, ওইসব শাদামূর্তি
যাদের দৃষ্টিও নেই, বাকশক্তি নেই।
ভুলে গেছি তোমার ও কণ্ঠস্বর, আনন্দিত সেই সব ধ্বনি;
ভুলে গেছি ওই দুটি চোখ।
পুষ্প যেমন বাঁধা আঘ্রাণের সাথে,বাঁধা পড়ে আছি আমি
তোমারই তো অস্পষ্ট স্মৃতির ভেতরে। শুধু এক জখমের
যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে বাঁচি; স্পর্শ করো না এতো তাড়াতাড়ি,
অনারোগ্য হতে পারে এই টাটকা ক্ষতটি আমার।
তোমার সুশ্রুষাগুলো আমার সমগ্র দেবে মেলে, যেরকম
মলিন করুণ সব দেয়ালে দেয়ালে, বেয়ে ওঠে দ্রাক্ষালতাগুলি।
তোমার প্রণয় আমি বিস্মৃত হয়েছি, আজও তবু
প্রতিটি জানালাজুড়ে চোখে ভাসে তোমারই তো সেই প্রিয় মুখ।
তোমারই কারণে, এই আসন্ন গ্রীষ্মের যত সুবাস মদিরা
আমাকে যন্ত্রণা দেয়; তোমারই কারণে আমি পুনরায়
পতিত প্রত্যাশা-চিহ্নে খুঁজে ফিরে আশার আলোক :
নিক্ষিপ্ত তারকারাজি, বিক্ষিপ্তও পতন্মোখ যত বস্তুনিচয়
সব ঘেঁটে, তোমারই অস্তিত্ব খুঁজেফিরি।

আদর্শ ছেলে -কুসুমকুমারী দাশ

আমার এ জন্মদিন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার এ জন্মদিন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার এ জন্মদিন-মাঝে আমি হারা
আমি চাহি বন্ধুজন যারা
তাহাদের হাতের পরশে
মর্ত্যের অন্তিম প্রীতিরসে
নিয়ে যাব জীবনের চরম প্রসাদ,
নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ।
শূন্য ঝুলি আজিকে আমার;
দিয়েছি উজাড় করি
যাহা-কিছু আছিল দিবার,
প্রতিদানে যদি কিছু পাই
কিছু স্নেহ, কিছু ক্ষমা
তবে তাহা সঙ্গে নিয়ে যাই
পারের খেয়ায় যাব যবে
ভাষাহীন শেষের উৎসবে।

আদর্শ ছেলে -কুসুমকুমারী দাশ

আদর্শ ছেলে -কুসুমকুমারী দাশ

আমার এ জন্মদিন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকু

আদর্শ ছেলে -কুসুমকুমারী দাশ

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ?
মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন
“মানুষ হইতে হবে” — এই তার পণ,
বিপদ আসিলে কাছে হও আগুয়ান,
নাই কি শরীরে তব রক্ত মাংস প্রাণ ?
হাত, পা সবারই আছে মিছে কেন ভয়,
চেতনা রয়েছে যার সে কি পড়ে রয় ?
সে ছেলে কে চায় বল কথায়-কথায়,
আসে যার চোখে জল মাথা ঘুরে যায় |
সাদা প্রাণে হাসি মুখে কর এই পণ —
“মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন” |
কৃষকের শিশু কিংবা রাজার কুমার
সবারি রয়েছে কাজ এ বিশ্ব মাঝার,
হাতে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান
তোমরা মানুষ হলে দেশের কল্যাণ

নূতন কাল – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Bangla Kobita)

আমাদের কালে গোষ্ঠে যখন সাঙ্গ হল
সকালবেলার প্রথম দোহন,
ভোরবেলাকার ব্যাপারীরা
চুকিয়ে দিয়ে গেল প্রথম কেনা বেচা,
তখন কাঁচা রৌদ্রে বেরিয়েছি রাস্তায়,
ঝুড়ি হাতে হেঁকেছি আমার কাঁচা ফল নিয়ে–
তাতে কিছু হয়তো ধরেছিল রঙ, পাক ধরে নি।
তার পর প্রহরে প্রহরে ফিরেছি পথে পথে;
কত লোক কত বললে, কত নিলে, কত ফিরিয়ে দিলে,
ভোগ করলে দাম দিলে না, সেও কত লোক–
সে কালের দিন হল সারা।

কাল আপন পায়ের চিহ্ন যায় মুছে মুছে,
স্মৃতির বোঝা আমরাই বা জমাই কেন,
এক দিনের দায় টানি কেন আর-এক দিনের ‘পরে,
দেনা-পাওনা চুকিয়ে দিয়ে হাতে হাতে
ছুটি নিয়ে যাই না কেন সামনের দিকে চেয়ে।
সেদিনকার উদ্‌বৃত্ত নিয়ে নূতন কারবার জমবে না
তা নিলেম মেনে।
তাতে কী বা আসে যায়।
দিনের পর দিন পৃথিবীর বাসাভাড়া
দিতে হয় নগদ মিটিয়ে।
তার পর শেষ দিনে দখলের জোর জানিয়ে
তালা বন্ধ করবার ব্যর্থ প্রয়াস,
কেন সেই মূঢ়তা।

         তাই প্রথম ঘণ্টা বাজল যেই
বেরিয়েছিলেম হিসেব চুকিয়ে দিয়ে।
দরজার কাছ পর্যন্ত এসে যখন ফিরে তাকাই,
তখন দেখি তুমি যে আছ
এ কালের আঙিনায় দাঁড়িয়ে।
তোমার সঙ্গীরা একদিন যখন হেঁকে বলবে
আর আমাকে নেই প্রয়োজন,
তখন ব্যথা লাগবে তোমারই মনে
এই আমার ছিল ভয়–
এই আমার ছিল আশা।
যাচাই করতে আস নি তুমি–
তুমি দিলে গ্রন্থি বেঁধে তোমার কালে আমার কালে হৃদয় দিয়ে।
দেখলেম ওই বড়ো বড়ো চোখের দিকে তাকিয়ে,
করুণ প্রত্যাশা তো এখনো তার পাতায় আছে লেগে।

      তাই ফিরে আসতে হল আর একবার।
দিনের শেষে নতুন পালা আবার করেছি শুরু
তোমারি মুখ চেয়ে,
ভালোবাসার দোহাই মেনে।
আমার বাণীকে দিলেম সাজ পরিয়ে
তোমাদের বাণীর অলংকারে–
তাকে রেখে দিয়ে গেলেম পথের ধারে পান্থশালায়,
পথিক বন্ধু, তোমারি কথা মনে ক’রে।
যেন সময় হলে একদিন বলতে পার
মিটল তোমাদেরও প্রয়োজন,
লাগল তোমাদেরও মনে।
দশ জনের খ্যাতির দিকে হাত বাড়াবার দিন নেই আমার।
কিন্তু তুমি আমাকে বিশ্বাস করেছিলে প্রাণের টানে–
সেই বিশ্বাসকে কিছু পাথেয় দিয়ে যাব এই ইচ্ছা।

         যেন গর্ব করে বলতে পার
আমি তোমাদেরও বটে,
এই বেদনা মনে নিয়ে নেমেছি এই কালে–
এমন সময় পিছন ফিরে দেখি তুমি নেই।
তুমি গেলে সেইখানেই
যেখানে আমার পুরোনো কাল অবগুণ্ঠিত মুখে চলে গেল,
যেখানে পুরাতনের গান রয়েছে চিরন্তন হয়ে।
আর, একলা আমি আজও এই নতুনের ভিড়ে বেড়াই ধাক্কা খেয়ে,
যেখানে আজ আছে কাল নেই।

Another Bangla Kobita

Bangla Noboborsho kobita By Rabindranath Tagore

বাংলা নববর্ষ বাঙালির এক অনন্য উৎসব, বাংলার অন্যতম জাতীয় উৎসব। নববর্ষ মানে নবজন্ম বা পুনর্জন্ম বা পুনরুজ্জীবনের ধারণা,আর সেই পুনরুজ্জীবনের ধারণা, পুরাতন বছরকে বিদায় দেয়া, নতুন বৎসরে প্রবেশ করার আনন্দ বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকের কলমে প্রকাশ পেয়েছে বহুকাল ধরে। আমরা ঠিক তারই একটা ছোঁয়া পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নববর্ষ নিয়ে লিখিত বিভিন্ন কবিতায়।

নববর্ষে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন

বর্ষ হয় গত!

আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন

করিলাম নত।

বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও,

ক্ষমা করো আজিকার মতো

পুরাতন বরষের সাথে

পুরাতন অপরাধ যত।

আজি বাঁধিতেছি বসি সংকল্প নূতন

অন্তরে আমার,

সংসারে ফিরিয়া গিয়া হয়তো কখন

ভুলিব আবার।

তখন কঠিন ঘাতে এনো অশ্রু আঁখিপাতে

অধমের করিয়ো বিচার।

আজি নব-বরষ-প্রভাতে

ভিক্ষা চাহি মার্জনা সবার।

আজ চলে গেলে কাল কী হবে না-হবে

নাহি জানে কেহ,

আজিকার প্রীতিসুখ রবে কি না-রবে

আজিকার স্নেহ।

যতটুকু আলো আছে কাল নিবে যায় পাছে,

অন্ধকারে ঢেকে যায় গেহ —

আজ এসো নববর্ষদিনে

যতটুকু আছে তাই দেহো।নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন

বর্ষ হয় গত!

আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন

করিলাম নত।

বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও,

ক্ষমা করো আজিকার মতো

পুরাতন বরষের সাথে

পুরাতন অপরাধ যত।

আজি বাঁধিতেছি বসি সংকল্প নূতন

অন্তরে আমার,

সংসারে ফিরিয়া গিয়া হয়তো কখন

ভুলিব আবার।

তখন কঠিন ঘাতে এনো অশ্রু আঁখিপাতে

অধমের করিয়ো বিচার।

আজি নব-বরষ-প্রভাতে

ভিক্ষা চাহি মার্জনা সবার।

আজ চলে গেলে কাল কী হবে না-হবে

নাহি জানে কেহ,

আজিকার প্রীতিসুখ রবে কি না-রবে

আজিকার স্নেহ।

যতটুকু আলো আছে কাল নিবে যায় পাছে,

অন্ধকারে ঢেকে যায় গেহ —

আজ এসো নববর্ষদিনে

যতটুকু আছে তাই দেহো।

 

Another Bangla Kobita